জেনে নিন কী ভাবে শুরু হয়েছিল হাত ধোওয়া, আর বিষয়টি কতটা জরুরি এখন…

কোভিড-১৯ অতিমারী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই ভাইরাস থেকে বাঁচবার প্রথম উপায় হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে হাত ধোয়াকে। সাবান ও জল দিয়ে ঘষে ঘষে হাত ধোয়া বহু মারাত্মক অসুখ ছড়ানো প্রতিরোধ করতে সর্বাপেক্ষা কার্যকরী উপায়, একখা আজ সর্বজনস্বীকৃত সাধারণ জ্ঞান।

কিন্তু এই হাত ধোওয়ার অভ্যাস কীভাবে তৈরি হল? অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়। ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালে চাইল্ড বেড ফিভার যেন ছেঁকে ধরছিল। প্রসূতি মায়েরা মারা যাচ্ছিলেন দলে দলে। কিন্তু কেন? কারণ খুঁজতে বসলেন হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগনাজ ফিলিপ স্যামেলওয়াইজ। তাঁর মনে হল, এর কারণ অপরিচ্ছন্নতা নয় তো! ফলে চিকিৎসকদের জন্য নতুন নিয়ম জারি করলেন তিনি। বললেন, অন্তঃসত্ত্বাদের পরীক্ষা করার আগে হাত ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে ক্লোরিনেটেড লাইম দিয়ে। ধুতে হবে যন্ত্রপাতিও। তার পর দেখা যাবে, সমস্যা কমে কি কমে না।

শুরু হল হাত ধোওয়া, যন্ত্র ধোওয়ার পর্ব। অবাক কাণ্ড, ফল পাওয়া গেল হাতে হাতে। গোটা বছরে এক জনেরও মৃত্যু হল না। স্যামেলওয়াইজ বুঝে গেলেন, তাঁর ধারণাই ঠিক । ঝামেলার মূলে আছে অপরিচ্ছন্নতাই। ফলে যাবতীয় পরিসংখ্যান দিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞান পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করলেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। কিন্তু তখনও ‘জীবাণু’ বলে যে কিছু একটা আছে, তা নিয়ে ধারণা ছিল না কারও। ফলে হাত ধোওয়া এবং না ধোওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যখ্যা করতে পারলেন না তিনি। রেগে আগুন হয়ে গেলেন সবাই। রোগীমৃত্যুর দায় তিনি ডাক্তারদের উপর চাপাচ্ছেন! পরিস্থিতি এমন হল যে, চাকরি ছেড়ে তাঁকে ফিরে যেতে হল হাঙ্গেরিতে।

আরও পড়ুন: চিকিৎসকদের মৌলবাদীতায় হয়রানির শিকার বিশ্বের অগণিত রুগী

হাতে কাজ নেই। ভাঙা মন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করবেন রোগীদের সারিয়ে তোলার এটাও এক রাস্তা। শুরু করলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ১৮৬১ সালে, নামকরা এক বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করলেন গবেষণামূলক প্রবন্ধ। জানালেন, রোগীকে পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচার করার আগে ডাক্তারদের উচিত হাত ভাল করে ধুয়ে নেওয়া। কারণ তিনি দেখেছেন, মর্গে মৃতদেহ ঘাঁটার পর হাত না ধুয়ে রোগী দেখলে মৃত্যু বেশি হয়। নিশ্চয়ই মৃতদেহ থেকে ডাক্তারের হাত মারফত এমন কিছু ভয়ঙ্কর উপাদান রোগীর মধ্যে আসে, যা তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভাল করে হাত ধুলে যে এ বিপদ এড়ানো যায়, তারও অসংখ্য পরিসংখ্যান দিলেন তিনি। লাভ হল না।

download 1

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক ডিগ্রিধারীও তখন বিশ্বাস করতেন,  রোগ-শোক-মৃত্যুর মূলে রয়েছে দুষ্টু আত্মা। মানুষের সাধ্য নেই তাকে অতিক্রম করে। স্যামেলওয়াইজ পাগলের প্রলাপ বকছেন। এবার চিকিৎসকদের চিঠি পাঠাতে শুরু করলেন তিনি। অনুরোধ করলেন, “একবার তো নিয়ম মেনে দেখুন। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর এটাই এক বড় রাস্তা। আর যদি তা না করেন,  ধরে নিতে হবে মানুষ খুন করছেন আপনারা।” পরিস্থিতি চরমে উঠল। ঘরে-বাইরে সবাই ভাবতে শুরু করলেন, তিনি পাগল হয়ে গেছেন। গভীর একাকীত্ব ও হতাশা গ্রাস করল তাঁকে। ভুগতে শুরু করলেন অবসাদে। তখন তাঁকে পাঠানো হল মানসিক হাসপাতালে। ১৮৬৫ সাল সেটা। বলা হল ‘নিউরো সিফিলিস’ হয়েছে তাঁর, কেউ বললেন ভর করেছে প্রেতাত্মা।

হাসপাতালে শুরু হল অশরীরী ছাড়ানোর চিকিৎসা। মারধর। দিনের পর দিন। ক্ষত-বিক্ষত শরীর বিষিয়ে উঠতে লাগল। বিষ ছড়াল সারা শরীরে, রক্তে। এবং কার্যত বিনা চিকিৎসায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালের ১৩ আগস্ট সেপটিসিমিয়ায় মারা গেলেন তিনি। মৃত্যুর মাত্র দু বছর পর, বিশিষ্ট শল্যচিকিৎসক জোসেফ লিসার সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া আটকাতে হাত ধোয়া ও ইন্স্ট্রুমেন্ট জীবাণুমুক্ত করার উপর জোর দিলেন। ১৮৭০ থেকে চিকিৎসকরা এ পদ্ধতি গ্রহণ করলেন। স্যামেলওয়াইজের কাজ সুই পাস্তুরের জীবাণু তত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি। পাস্তুরের জীবাণু তত্ত্ব বহু রোগের ক্ষেত্রে বর্তমানে গৃহীত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

স্যামেলওয়াইজ প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করলেন, সুস্থ থাকতে গেলে হাত ধোওয়া বাধ্যতামূলক। এটা পাগলামি নয়, বিজ্ঞান। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সব চেয়ে বেশি সচেতনতা তৈরি হল করোনা কালে। এই তত্ত্বকে আরও অনেক বেশি জোরদার করল এই ক্ষুদ্র ভাইরাস। মেডিসিনের চিকিত্সক সুকমার মুখোপাধ্যায় বলেন, মাস্ক পরার সঙ্গে সঙ্গে বার বার হাত ধোওয়াই সুস্থ থাকার একমাত্র চাবিকাঠি এই মুহূর্তে।

আরও পড়ুন: যোগ্য নেতা পেলে বাংলায় অসম্ভব নয় বামফ্রন্টের কামব্যাক