মৃত্যুর ৭৫ বছর পরে বিরল সম্মানে ভূষিত টিপু সুলতানের বংশধর ও ব্রিটিশ চর নূর ইনায়েত খান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের চর, ভারতীয় বংশোদ্ভূত নুর ইনায়েত খানের সম্মানে স্মারক ফলক বসল সেন্ট্রাল লন্ডনে তাঁরই পরিবারের পুরনো বাড়ির পাশে। নুরই প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা, যাঁর স্মৃতিতে সম্মান জানানোর জন্য ‘ব্লু প্লাক’ বসানো হল। শুক্রবার ব্লুমসবেরির ৪, ট্যাভিটন স্ট্রিটে ফলকটি বসানো হয়েছে।স্মৃতি ফলকটি ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে উদ্বোধন করেন নূরের জীবনীকার শ্রাবণী বসু।

মাত্র ২৯ বছর বয়সে এই বাড়ি ছেড়েই দেশের জন্য চরবৃত্তির উদ্দেশে রেডিও অপারেটর পরিচয়ের আড়ালে নাৎসি কবলিত ফ্রান্সে যাত্রা করেন নূর ইনায়েত খান। আমেরিকান মা ও ভারতীয় রাজ পরিবারের সদস্য বাবার সন্তান নূরের জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়। তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ হয় ফ্রান্সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে প্রান্স ছেড়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন। মুসলিম সুফি ধর্মাবলম্বী পরিবারের মেয়ে নূর আজীবন অহিংসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী হলেও দেশের প্রয়োজনে চরবৃত্তির মতো দুঃসাহসিক অভিযানে সাগ্রহে অংশ নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে বিজেপি, ফাঁস করল ফেসবুক

৪, ট্যাভিটন স্ট্রিটের এই বাড়িতে নুর থাকতেন ১৯৪৩ সালের আগে পর্যন্ত। তারপর ১৯৪৪ সালে তিনি নাৎসিদের দখলে থাকা ফ্রান্সে যান প্রথম ব্রিটিশ মহিলা গুপ্তচর হিসাবে। ব্রিটেনের স্পেশ্যাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ-এর (এসওই) হয়ে ‘আন্ডারকভার রেডিও অপারেটর’ হিসাবে ম্যাডালিন নাম নিয়ে অধিকৃত ফ্রান্সে গিয়েছিলেন নুর। নাৎসি বিরোধী প্রতিবাদ দমন করতে অসংখ্য মানুষকে গ্রেফতার করে হিটলারের গেস্টাপো (পুলিশ) বাহিনী। সেই দলভুক্ত ছিলেন নূরও। জার্মান পুলিশ তাঁকে ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিলে পরিচয় ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন নূর। তাঁকে পাঠানো হয় ডাশাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানেই ১৯৪৪ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। মৃত্যুর আগে তাঁর বলা শেষ কথা ছিল ‘লিবের্তে’, অর্থাৎ স্বাধীনতা।

পরবর্তীকালে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য নূর ইনায়েত খানকে অন্যতম সর্বোচ্চ ব্রিটিশ সম্মান মরণোত্তর ‘জর্জ ক্রস’ প্রদান করা হয়। তাঁর জীবনীকার শ্রাবণী বসুর নিরন্তর প্রচারের ফলে ২০১২ সালে লন্ডন শহরে নূরের মূর্তি বসায় ব্রিটিশ প্রশাসন।এবার তাঁর সাহসিকতাকে ভূষিত করা হল ‘ব্লু প্লাক’ সম্মান দিয়ে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুফি সন্ত, হজরত ইনায়ত খানের এই কন্যা মাইসোরের শাসক টিপু সুলতানের বংশের উত্তরাধিকারীও ছিলেন। তাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে বই লিখেছেন শ্রাবণী বসু, যার নাম ‘স্পাই প্রিন্সেস : দ্য লাইফ অফ নুর ইনায়েত খান’। ব্রিটিশ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারীদের সম্মানে ১৫০ বছর ব্যাপী মরণোত্তর নীল ফলক প্রকল্প চালু করেছে ব্রিটেনের সরকার। কোভিড পরিস্থিতির জেরে লকডাউন পর্বে প্রথম ফলকটি বসতে চলেছে নূরের সম্মানেই। জীবনীকার শ্রাবণী বসুর বিবৃতিতে, ‘জীবনের শেষ অভিযানে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়ার সময় নূর হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি, একদিন সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হবে। তিনি একজন অসাধারণ চর ছিলেন।’

আরও পড়ুন: হঠাৎ পদত্যাগ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের, ক্ষমা চাইলেন দেশবাসীর কাছে