পথে নেমে শোকপ্রকাশ নয়, হুসেনের শাহাদাত থাকুক মনে -জীবনে …

সৈয়দ আলি মাসুদ

মহরম একটি মাসের নাম। এটি কোনও উৎসবের নাম নয়। চন্দ্র ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসের নাম ‘মুহাররম’। সেটিকেই আমরা বাঙালিরা নিজেদের উচ্চারণে মহরম বলে থাকি। ব্যাপারটা  পয়লা বৈশাখ এবং ফার্স্ট জানুয়ারির মত। তবে সাধারণ ভাবে যেদিনটিকে মহরম বলে বোঝানোর চেষ্টা হয় সেটি হল ১০ মুহাররম। এদিন বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু কারবালার সেই বিষাদঘন ঘটনা বাকি সব দিনগুলিকে ঢেকে দিয়েছে।

ইরাকের কারবালার মরু প্রান্তরে বিশ্বনবীর নাতি হুসেন ও তাঁর গোটা পরিবারকে হত্যা করে ইয়াজিদ নামক এক ক্ষমতালোভী। সে এক ভয়াবহ হত্যালীলা। হুসেন যুদ্ধ চাননি।তিনি ইয়াজিদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি। শুধু তাঁকে নয়,  শিশুদের পর্যন্ত ছাড় দেয়নি ইয়াজিদের নরপিশাচরা। খুন করে শিশুদের মাথা বর্শার ফলকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।আর হুসেনের কাটা মাথা নিয়ে গিয়েছিল ইয়াজিদের দরবারের। সেদিনটি ছিল ১০ মহরম। কারবালার দুঃসহ গরমে তেষ্টায় ছাতি ফাটলেও কাউকে জল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এই ইতিহাস কমবেশি অনেকের জানা।কল্পনা, আবেগ এবং ইতিহাসের সংমিশ্রনে কারবালার  ঘটনাকে তুলে ধরেছেন মীর মোশারফ হোসেন । ‘বিষাদসিন্ধু’ তাঁর অসাধারন সৃষ্টি।  পরে অবশ্য অনেকে বলেছেন এই লেখনী অসম্ভব সুন্দর হলেও, গোটা লেখাটিতে সর্বদা ইতিহাসের অনুসরণ করা হয়নি। সে কারণেই বোধহয় তা এমন হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। যাই হোক। সে কারণে লিখতে বসা সেই বিষয়ে আসা যাক।

আসলে ১০ মহরম উজ্জাপনের বিষয় নয়। তা স্মরণের বিষয়।  এই স্মরণ নিজেদের জন্য। হুসেনের জন্য নয়। যেভাবে নকল শোক প্রকাশ করা হয় তা যুক্তি, বুদ্ধি এবং আবেগ- কোথাও ঠাঁই পাই না। শোক প্রকাশের এমন ভঙ্গিও স্বাভাবিক জীবনে নজরে আসে না। অতি নিকটজনের বিয়োগেও আমরা এমন আচরণ করি না। তাছাড়া ইসলামও এমন শোক প্রকাশকে অনুমোদন করে না। মুশকিল হল শোক প্রকাশ যখন আনুষ্ঠানিক হয়ে পরে তখন তাকে থামানো দায়।  ঢাল-তলোয়ার সহযোগে যে শোভা যাত্রা বের হয় -এবার এই  আনুষ্ঠানিকতা পরিত্যাজ্য হয় উচিত। কারণ তা ইসলামের মূল নীতি ও ধারার বিরোধী।বরং নিরপেক্ষ চোখে দেখলে এর বহিরঙ্গ খানিকটা রামনবমী উজ্জাপনের মতই। তাই খুব মোটা দাগের একটা বিনোদন রস কেউ কেউ পান। এর বেশি কিছু নয়।

আরও পড়ুন: চিকিৎসকদের মৌলবাদীতায় হয়রানির শিকার বিশ্বের অগণিত রুগী

রাস্তায় মিছিল করে, পুজোর বিসর্জনের ঢঙে মহরম বলে যে অনুষ্ঠানটি চলে তার সঙ্গে ইসলামের কোনও সম্পর্ক নেই। ওই মিছিলে যারা থাকে তাদের একটা বড় অংশই অশিক্ষিত। রথের মডেলের তাজিয়া বের হয়। ঢাকিদের উৎসাহের অন্ত থাকে না। এমন দেখা গিয়েছে এই ঢাকিরাই কোথাও কোথাও  মহরম উৎসবের অন্যতম আয়োজক। তারা যে মুসলিম নয় একথা না বললেও চলত। বলার উদ্দেশ্য হল ব্যাপারটি সম্পূর্ণ সেকুলার।

সুপ্রিম কোর্ট যেমন ইসলামে নিষিদ্ধ তিন তালাক বেআইনি ঘোষণা করেছে, তেমনই মহরম বলে চালানো এই বেলাল্লাপনা বন্ধ করলে মন্দ হয় না। তাতে ঢাকি এবং তাদের কিছু মদ্যপ সাঙ্গপাঙ্গদের মনখারাপ হবে ঠিকই। কিন্তু বাকিদের ভালোই হবে। একটা কথা হলফ করে বলতে পারি রাস্তার মহরম ইসলামী অনুষ্ঠান নয়। শিক্ষিত-সচেতন মুসলিমের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে কোনো যোগ নেই। যেমন নেই তাৎক্ষণিক তিন তালাকে। যেমন নেই একাধিক বিবাহে।

28 08 2020 muharram 2020 20679602

মহরমের ‘রামনবমীপনা’ বন্ধ হোক। বরং সেদিনের স্মরণ করে কারো চোখ দিয়ে যদি দুফোঁটা জল আসে তো আসুক। বিষাদসিন্ধু পড়তে গিয়ে কারও যদি গলায় কান্না দলা পাকায় তো পাক। কারোর মুখ থেকে কারবালার  সেই দিনের কথা শুনতে শুনেত যদি ফুঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে তো করুক। তাতে সমস্যা নেই। সত্যের জন্য, ইনসাফের জন্য, জুলুমের বিরুদ্ধে কিভাবে শিরদাঁড়া টান-টান করে দাঁড়াতে হয় তা এদিন আমরা স্মরণ করব।  হুসেনের শাহাদত এই বিশ্বের শেষ দিন পর্যন্ত ন্যায়পরায়ন লোকেদের পাথেয়। এদিন বেশি করে তাদের ত্যাগ-সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। তাতে নিজেদেরই লাভ। নিজের ভিতর যে শক্তি রয়েছে এই দিনগুলিতে আমরা তার পুনর্জাগরণ ঘটাতে পারি।

কারবালা যুদ্বের পরিণতি বিশ্বের সবার জানা। এটিই বিশ্বের একমাত্র যুদ্ধ, যেখানে পরাজিতদের শাহাদত স্মরণ করে গোটা বিশ্ব। জয়ীকে দেখা হয় ঘৃণার চোখে।তাই যারা বলে ‘ইভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এণ্ড ওয়ার’ তাদের ক্ষমতালোভী, স্বার্থপর প্রচার এখানে পরাজিত হয়। শুধু জয়ী হলেই হয় না। তাতে ন্যায় ও নীতি থাকতে হবে।  নীতিহীন জয় কেবল দুর্যোধন এবং ইয়াজিদের জন্ম দেয়। তাদের আমরা ভয় করতে শিখব। জীবনের সবক্ষেত্রে। গণতন্ত্রে কিংবা রাজতন্ত্রে। নীতিহীন জয়ের আস্ফালন ক্ষণস্থায়ী। জলুমের মাত্রা যতই বাড়ানো হোক।  তবুও তার পরিধি সীমিতই থাকবে। এটা মনে রাখতে হবে রাজা-প্রজা, শাসক, নাগরিক প্রত্যেকেই। ১০ মহরম আমাদের কাছে আসলে সেই পাঠই দেয়।

একটা বিষয় যেটা এখানে না উল্লেখ করলেই নয়- তা হল ‘আস্থা’য় যাদের প্রবল আস্থা সেই সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য মহরমের শোভাযাত্রার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।কারণ হিসাবে বলা হয়েছে করোনা ভাইরাস- এর কথা।  পুরীর রথযাত্রার কথা অবশ্য ভিন্ন। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র খোদ সুপ্রিম কোর্টের কাছে আর্জি জানিয়েছিল। ঐতিহ্য এবং আস্থার কথা ফের শোনানো হয়েছিল। রাজি হয়েছিল শীর্ষ কোর্ট। যারা করোনার দায় তবলীগ জামাতের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে, তারা মহরমের শোভাযাত্রারর জন্য যে আবেদন করবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাতে ভালই হয়েছে। রাষ্ট্র যে গরিষ্ঠের আস্থাকেই কেবল গুরুত্ব দেবে, এটা সব সংখ্যালঘুদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত।

কারবালার ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিন এই ভিডিও- র মাধ্যমে…

আরও পড়ুন: বাংলা সাহিত্যের যে উপন্যাসগুলো জীবনে একবার হলেও পড়া উচিত…

(মতামত ব্যক্তিগত)