ভুয়ো ডাক্তারে আতঙ্ক, ভুয়ো নেতাতে নয় কেন ?

শিক্ষক এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার বাবা কী করেন? উত্তরে ছেলেটি বলে- 'আগে সিপিএম করত এখন তৃণমূল করে'।
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on email
Share on reddit
Share on pinterest

মেহনাজ পারভিন

মাঝে মধ্যেই ভুয়ো চিকিৎসকদের ধরা শুরু হয় । যেভাবে জাল ওষুধ ও ভেজাল খাবার ধরা হয়, সেইভাবেই এই চিকিৎসকদের পাকড়াও করা হয়। মাঝে মাঝেই প্রশ্ন জাগে, ভুয়ো নেতা ধরা শুরু হবে কবে? সম্ভবত ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনার কারণে তা শুরু হবে না কখনও।

আজকাল নেতা হওয়া একটা পেশা। একবার শিক্ষক এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার বাবা কী করেন? উত্তরে ছেলেটি বলে- ‘আগে সিপিএম করত এখন তৃণমূল করে’। কথা শুনে গোটা ক্লাসরুম হেসে লুটোপুটি। এখনকার সময় হলে হয়ত ওই পড়ুয়াটি বলত, ‘আগে তৃণমূল করত এখন বিজেপি করে ।’ কিন্তু একথা সত্য যে, ছোটোখাটো নেতা হওয়া আজকাল একটা পেশা। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে রোজগার ভালোই হয়। ভালোই হয়। অজগাঁয়ে পার্টি করে বহুজন বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছেন । ঠিক যেভাবে গ্রামেগঞ্জে নির্বিচারে গর্ভপাত করিয়ে বহু হাতুড়ে ধনী হয়ে যান।

আরও পড়ুন : স্ট্র্যান্ড রোডের বহুতলে ভয়াবহ আগুন, নীচেই পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের শাখা

নেতাদের কেউ কখনও প্রশ্ন করেনি, এই নেতা হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা কী? কারও মনে শঙ্কা জাগেনি যে, আদৌ নিজেকে নেতা বলে দাবি করা মানুষটা কি নেতা! নাকি ভুয়ো। আসলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতাদের সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণাই রয়েছে। তাই নেতারা আসল ও খাঁটি হবেন এমনটা সম্ভবত কেউই আসা করেন না। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা গুনতিতে বাড়ছেন। নেতা হতে গেলে শিক্ষাগত যোগ্যতা জরুরি নয়। কোনও বিশেষ দায়বদ্ধতাও তাদের থাকে না। বিশেষ কোনও শপথও নেতাদের নিতে হয় না।

আমাদের দেশে হাতুড়ে (কোয়াক) ডাক্তার নিয়ে নাক সিঁটকানো হয় খুবই। কোনও ভাবেই ডাক্তারদের সমতুল্য মনে করা হয় না তাঁদের। আর তা উচিতও নয়। তবে রাতবিরেতে গ্রামাঞ্চলে মানুষের ভরসা সেই হাতুড়ে ডাক্তাররাই। পেটে ব্যথা, বুকে ব্যথা, মাথা ফাটা- প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেন এই কোয়াক ডাক্তাররাই।

প্রতিবছরই ডাক্তারি পাস করছেন কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে। কিন্তু গ্রামে যেতে নারাজ প্রত্যেকেই। ডাক্তারিতে ‘ওথ নেওয়ার পর বড়মুখ করে হবু ডাক্তাররা সবাই ভাল চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার শপথ নিয়ে থাকেন। কিন্তু কাজের বেলা লবডঙ্কা। এমবিবিএস ডিগ্রি পেয়ে যাওয়ার পরই শুরু হয় তাঁদের অন্যরকম ভাবনা। এমডি হলে তো কথায় নেই। তখন তাদের কাছে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়, কত দ্রুত ধনী হওয়া যাবে। সেই চিন্তাতেই আজকাল বেশিরভাগ চিকিৎসক বুঁদ হয়ে থাকেন।

যারা চাকরি করতে শুরু করেন, তাদের টার্গেট থাকে কোনওমতে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নশিপটা পুরো করে নিয়ে বেসরকারি নার্সিংহোমে অথবা হাসপাতালগুলোতে যোগ দেওয়া। ইন্টার্নশিপের পর ভাল রাস্তাঘাট নেই, বেশি নার্সিং স্টাফ নেই, বৃষ্টি হলেই যেখানে একহাঁটু জল জমে যায়- এমন গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে খুব একটা আগ্রহী হন না কোনও নয়া ডাক্তারই। তাই গ্রামের মানুষদের ভরসার বড় জায়গা হলেন হাতুড়ে ডাক্তাররা।

এই হাতুড়ে ডাক্তারদের নিয়ে আদতে সমস্যা নেই খুব একটা। গ্রামের মানুষরা জানেনও যে, সেই মানুষটা ডাক্তারি পাস নন। শুধু মেডিক্যালের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু আছে। সেই জ্ঞানটুকু কোনও ডাক্তারের কম্পাউন্ডার হিসাবে কাজ করে হয়ত সে অর্জন করেছে। তাই হাতুড়ে ডাক্তাররা বড় কোনও অপারেশন করে না সহজে। কারণ, নিজের বিদ্যের দৌড় তার জানা। তাই প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুর পরই তড়িঘড়ি জেলা হাসপাতালে তারা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু টাকার লোভে কেউ কেউ যে আহাম্মকি করে না তা নয়। তাতে বিপদও বাড়ে।

রাজনীতির ক্ষেত্রটা আলাদা। দলের পতাকার তলায় গরম গরম চারটে কথা বললেই সকলে নেতা বলে ধরে নেয়। বহু সময় দেখা যায় এরা আসলে নেতা নন। নেতাদের সঙ্গে ঘুরে ও ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে তারা নেতা সেজে থাকেন। সেই ছবি দেখিয়ে তার লােককে চমকান। কাজ করে দেওয়ার নাম করে, কখনও চাকরি করে দেওয়ার নাম করে এরা লােকের কাছ থেকে টাকা নেয়। মাঝে মাঝে কোনও বড় নেতাকে ফোন করে, তার সঙ্গে কত ভোট আছে তা জাহির করে, ​নিজেকে নেতা হিসাবে জাহির করে।

জনদরদি ভাবমূর্তির আড়ালে যে লোকগুলি দাঙ্গাবাধানোর ছক কষে, প্রতিদিন  ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে যারা হারামের টাকা খায়, মানুষকে কেবল যারা ইভিমের বোতাম ভাবে, তাদের নেতা বলা যায় না।  নেতার সংজ্ঞা হিসাবে বলা যায়, এমন একজন মানুষ যিনি সমাজের সমস্যার কথা তুলে ধরবেন। সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। তার দলের মধ্যে যদি কোনও সমস্যা থাকে তাহলে তা দূর করার চেষ্টা করবেন।

নেতার ভাবমূর্তি হবে স্বচ্ছ। সমাজের মানুষের ভালাের জন্য তাঁর কাজ করার মানসিকতা থাকবে। কিন্তু এখন সত্যিই কী এই ধরনের জনদরদি নেতার দেখা মেলে এ সমাজে? মেলে না। এখন সমাজে এমন সব নেতার দেখা মেলে যাঁরা যে যার নিজের আখের গােছাতে সদাব্যস্ত। কালােবাজারিদের সঙ্গে তাঁদের নিত্য ওঠাবসা। শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পতাকার ছত্রছায়াতে থেকে নিজেদের নেতা হওয়ার দাবি করে এরা করে  চলে অবিরত । মানুষও কেমন যেন তাতে  অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।

বদলে গিয়েছে নেতার সংজ্ঞা। এখন সবাই ভাবে, নেতা মানেই কিছু গরম গরম কথা। সেই কথায় ভরসা করে মানুষ ভােট দেবেন ঠিকই। কিন্তু ভােটের ফল বেরােলে বদলে যাবে সবটা। তখন সেই জনদরদি নেতাটি আর কাউকে চিনতে পারবেন না। নিজের প্রতিশ্রুতি ভুলে যেতে যার এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। মানুষও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে এইসব জনদরদি নেতাদের মুখােশ পরা মুখ দেখতে। ঠিক যেমন অভ্যস্ত হয়ে  গিয়েছে ভুয়াে ডাক্তারের সঙ্গে।

অনেক রকম ধরপাকড়ের পরও সমাজে যেমন ভুয়াে ডাক্তাররা থেকে যাবেন; শুধুমাত্র বি.কম ডিগ্রি নিয়ে যাঁরা বহাল তবিয়তে বড় বড় নার্সিংহােমে কাজ করবেন।  তবে  ভুয়াে ডাক্তারদের চেনা যায় । কিছু ধরাও পড়ে।  কিন্তু ভয় লাগে এই সব ভুয়াে নেতাদের দেখেই। যাঁদের ধরা যাবে না কখনও | সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যারা থেকে যাবেন ক্যানসারের মতাে। ভালমানুষির মুখােশ পরে কুরে কুরে খাবেন সমাজকে। যাঁদের চেনা যাবে কিন্তু ধরা যাবে না কোনও দিনই।

আরও পড়ুন : আরও বাড়বে গরম, ৪৮ ঘণ্টায় তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করল হাওয়া অফিস

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on email
Share on reddit
Share on pinterest