অর্ধসত্য…

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on email
Share on reddit
Share on pinterest

অভিজিৎ সিনহা

এটা নতুন কিছু নয়। অনেকদিন ধরেই গোটা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়েই গেরুয়া বাহিনী চালাচ্ছে ভয়ানক প্রচার। এই দেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়। এই রাজ্যও তাই। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান, পারসিক, বৌদ্ধ; সবাই মিলে গড়ে তুলেছি এই দেশ তথা রাজ্যটাকে। এই সত্যই ভুলিয়ে দিতে চায় ওই বাহিনী। আর সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এই বাহিনীর বিপদ। রীতিমতো পেশাদার ঢংয়ে আইটি সেল খুলেছে তারা। এই সেল ঠিক করে দিচ্ছে প্রচারের লাইন। শুধু মিথ্যা বললে হবে না। লোকে সহজেই ধরে ফেলবে। তাই বলতে হবে সত্য মিথ্যা মিশিয়ে। এমনভাবে মেশাতে হবে যাতে সেটা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্য হয়। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বেড়ে যায় ঘৃণা। সন্দেহ নেই, এই লক্ষ্যে তারা অনেকাংশেই সফল। আর ঠিক সেই কারণে আমরা, যারা এক বার দেশ ভাগের শিকার হয়েছি এবং চাই না যে এই সুন্দর দেশটা আবার টুকরো হোক, রীতিমতো আতঙ্কিত।

২০১২ সালে আমার সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় পদার্পণ। তখন দেখতাম রোমিলা থাপারকে গালাগাল দিয়ে একটা টুইট। আর্যরা নাকি বাইরে থেকে আসেনি। যদিও এর তিন বছর আগেই, মানে ২০০৯ সালে, নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এক উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে জানানো হয়, ভারতবাসীদের মধ্যে রয়েছে দু-ধরনের জেনেটিক কোড। ANI এবং ASI। ANI-এর সঙ্গে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের মানুষের জিনের ব্যাপক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এবং আরো আশ্চর্যের, খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার বছরের আগে ভারতীয়দের মধ্যে এই জেনেটিক কোডটি খুঁজে পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় ASI কোডটির উপস্থিতি। তবে নির্জলাভাবে নয়, অন্য জেনেটিক কোডটির সঙ্গে মিশ্রিতভাবে। একমাত্র আন্দামানের অংগে উপজাতিটির মধ্যেই বিশুদ্ধ ASI পাওয়া যায়। এ-থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে খ্রি.পূ. চার হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া থেকে কোনো জাতি আসে ভারতে। তাদের একটি অংশ ইউরোপে যায়। এরা সমগ্র উত্তর ভারত দখল করে। এ-দেশের আসল অধিবাসীদের সঙ্গে মিশলেও, তাদের আপন করেনি কোনোদিন। যারা এদের সঙ্গে একেবারেই মিশতে চায়নি, তাদের এরা তাড়িয়েছে সুদূর আন্দামানে। আর যারা একটু হলেও মিশেছে, তাদের স্থান হয়েছে দক্ষিণ ভারতে।

আরও পড়ুন: Miss You SSR: সুশান্তহীন এক সপ্তাহ, দর্শকরা মনে রাখবে মিষ্টি হাসির ছেলেটাকে

কিন্তু এই তথ্য গেরুয়া বাহিনীর পক্ষে সহজপাচ্য নয়। যার কারণটা তাদের আরেকটা প্রচার দেখলেই বোঝা যাবে। তারা প্রায়শই বলে থাকে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে যে যারা বাইরে থেকে এসেছে, তারা এ-দেশকে ভালোবাসতে পারে না। এর থেকে বড় মিথ্যা আর হতে পারে না। আপাতত সে-কথা থাক। কিন্তু তাদের বিদেশি তাড়ানোর নিদান যদি আর্যদের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হয়, তবে তো সাড়ে সর্বনাশ। সুতরাং ওটা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য নয়। এখন অন্য বিষয় ধরে মুসলিম ও কমিউনিস্ট বিদ্বেষ ছড়ানো যাক। তার জন্য যদি জাল ভিডিয়ো ছড়াতে হয়, তাও ঠিক আছে। ‘মারি অরি, পারি যে কৌশলে।’ সুতরাং বসিরহাটের জাল ভিডিয়ো, কানহাইয়া কুমারের জাল ভিডিয়ো, ধূলাগড়ের সামান্য ঘটনা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো। অসত্য আর অর্ধসত্যের কারবারে মনোপলি মার্কেট করে নেওয়া।

দুঃখের হলেও বাস্তব এটাই যে, গেরুয়া বাহিনীর এই মার্কেটে ক্রেতা প্রচুর। আপনি-আমি নিজের অজান্তে কিনে চলেছি তাদের পণ্য। কিছুদিন আগে এই আইটি সেল হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজের মাধ্যমে প্রচার করল এক সংবাদ চ্যানেলের মালিক নাকি আদতে পাকিস্তানি। তার নামও ভিন্ন। ওই চ্যানেলটি তুলনায় একটু নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। অন্য চ্যানেলগুলি যেমন সারাক্ষণ মোদী ভজনা করে, এটি তেমন নয়। সুতরাং গেরুয়া শিবিরের চক্ষুশূল। আর সে-জন্যই এই মিথ্যার বেসাতি। আমাকে অন্ততপক্ষে চার জন ওই সূত্র ধরেই জানিয়েছে ওই মিথ্যা বার্তাটার কথা। এরা শিক্ষিত হলেও কোনো যাচাই না করেই গিলে নিয়েছে ওই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাটি। এটা সম্ভব হয়েছে আসল সত্যটি জানিয়ে কোনো জোরালো প্রতিবাদ না আসায়। অন্য ক্ষেত্রগুলিতে সেই একই ঘটনা ঘটেছে। বসিরহাট ধূলাগড়ে বাস্তবে কী ঘটেছে জানিয়ে কোনো ভিডিয়ো প্রচারিত হলো না। ভাইরাল হওয়া তো দূরস্থান। যাদের মুখর হওয়া উচিত ছিল, তারা কেমন আশ্চর্যভাবে চুপ মেরে গেলেন। ফলে আপারহ্যান্ড পেয়ে গেল মিথ্যার কারবারীরা।

শেষ করব আরো একটি বহুল প্রচলিত মিথ্যা দিয়ে। সেটি হলো, সংস্কৃত নাকি বাংলাভাষার জননী। এই মিথ্যা আমি ছোট থেকে শুনে আসছি। অথচ ভাষাচার্য সুনীতিকুমার জানিয়েছেন, বাংলা ভাষা মুন্ডারি গোত্রের বলে। সুহৃদ কুমার ভৌমিক আরো বিশদে জানিয়েছেন ধ্বনিতত্ত্ব বা রূপতত্ত্বের দিক থেকে মুন্ডা ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার কতটা মিল। তবে কি বাংলা ভাষায় তিন হাজার সংস্কৃত শব্দ নেই? আছে। ঠিক যেমন আছে আরবি, ফারসি, বর্মি, পর্তুগিজ এবং অন্যান্য ভাষা। আর শব্দ দেখে কোন ভাষা কোন ভাষাগোষ্ঠীর তা ঠিক হয় নাকি? যত বেশি অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে মেলামেশা হবে, তত অন্য শব্দ এসে শব্দভাণ্ডার স্ফীত করবে।

কিন্তু এ-সব কে বোঝাবে? আর কাকে?

আরও পড়ুন: পড়শিদের সঙ্গে সম্পর্কে চিড়, অর্থনীতি বেহাল, ‘অল ইজ ওয়েল’ মন্ত্র জপতে বলছে মোদী সরকার!

Gmail 6
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on email
Share on reddit
Share on pinterest